মৃত্যুর সাঁওতালি টার্ম বোঙাতালা বা হানাপুরি এনায়। সাঁওতালরা মনে করে, মৃত্যুর জন্য অপর একটি শক্তি হলেন স্বয়ং মৃত্যু রাজা যম। জোমরাজ বা রাজা হলেন পাতালপুরীর অধিপতি। তবে সাঁওতালদের মধ্যে এই ধারণাটি খুবই অস্পষ্ট। গ্রামে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে এক সময় ধামসার বাদ্যি বেজে উঠতো। এখন প্রচলন নেই। মৃত্যু সংবাদ নিয়ে বিভিন্ন গ্রামে লোক পাঠানো হয়। গডেৎ (গ্রামের বার্তাবাহক) মৃতকে দাহের জন্য বাড়ি বাড়ি ‘গঃ সাহান’ ডাকে। এই সংবাদ শুনে পাড়া প্রতিবেশী ও আত্মীয় স্বজনের মন এভাবেই কেঁদে উঠে—
“ধারতিম দাঁড়া কেদা রুগুমে রুগুমে
ধারতিম বাগিআদ বাচম রুওয়াড়,
ঞু কেদাম, জম কেদাম, আমদ কেদাম, ফুর্তি কেদাম। শেষ বেড়া রে দম রাঃ উতার কেদ”।
[গুটি গুটি পায়ে হেঁটে চলা পৃথিবীর শত পথ ছেড়ে আজ ফিরে না আসার পথে চলে গেলে। খাওয়া দাওয়া, আনন্দ ফুর্তি সবকিছু ফেলে সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেলে।]
অপঘাত বা দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু’র ক্ষেত্রে দুই ধরনের ব্যাখ্যা ব্যবহার করে যা যথাক্রমে ‘কীভাবে’ এবং ‘কেন’ প্রশ্নের উত্তর দেয়। বলা হয় যে দুষ্ট বোঙা এবং ঐন্দ্রজালিক শক্তিসম্পন্ন নারী-পুরুষেরা মানুষের এই মৃত্যুর কারণ। তারা শারীরিক ও মানসিক বৈকল্যতা সৃষ্টি করে এবং এইভাবে অসুস্থতা বা মৃত্যু ঘটায়। এছাড়াও যাকে ছাটিয়ার বা দীক্ষার মাধ্যমে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের পূর্ণ সদস্য করা হয়নি, যে নারীরা সন্তান প্রসবকালে বা গর্ভাবস্থায় মারা যায়, তারা বিপজ্জনক প্রেতাত্মায় পরিণত হতে পারে। তারা স্বর্গলাভ করে না এবং পূর্বপুরুষে রূপান্তরিত হবে না, যদি না মৃতের শেষকৃত্য, সৎকার এবং পরবর্তী শোক ও স্মরণ অনুষ্ঠান গুলো স্বাভাবিক ধারাবাহিক জীবন ও মৃত্যুর ধারণায় উপস্থাপিত কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে।
মৃতকে নিয়ে সমাজ বা ব্যক্তির বিশ্বাস কী? যতক্ষণ না শেষ কৃতকর্ম দ্বারা তাকে বিদায় জানানো না হয়, সে একজন সাঁওতালই থেকে যায়। সে এখনও তার পরিবারের একজন সদস্য, কিন্তু যতক্ষণ না সে নিরাপদে মৃতদের দেশে পৌঁছাচ্ছে, ততক্ষণ সে একজন অভিযোগকারী অদৃশ্য মানুষ। …ইহজগতে এবং স্বর্গজগতে সে ‘স্থানচ্যুত’। সে এখন মানুষের চেয়ে অনেক বেশি একটি বোঙা – এক অদৃশ্য কিন্তু নিবিড়ভাবে বাস্তব প্রেতাত্মার শক্তি।
কবর বা দাহ করার আগে মৃত ব্যক্তিকে স্নান করানো হয়। তারপর শরীরে নতুন পোশাক পরিয়ে দক্ষিণে মাথা রেখে শোয়ানো হয়। এরপর মৃতদেহকে মারকিন কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হয়। মুখমন্ডলে, হাতে, পায়ে তেল ও কাঁচা হলুদ মাখানো হয়। চারিদিকে গবর, দুর্বাঘাস, ধান ও ফুল কুলোয় নিয়ে ছিটানো হয়। বাড়ির আঙিনায় পরিবার থেকে শুরু করে গ্রামের সকল নারীরা এতে (ওজঃ সুনুম) অংশগ্রহণ করে। কাঁচা বাঁশের খাটিয়া তৈরি করে মৃতের বংশধরেরা মৃতকে কাঁধে করে শ্মশান বা কবরস্থানে নিয়ে যায়।
কবর বা দাহ'র নিজস্ব নিয়ম মেনে শ্মশান বা কবরের পাশে পুরুষেরা মৃতকে তেল, হলুদ ও পানি ছিটিয়ে বা ঢেলে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করে। চিতা বা কবরের চারিদিকে গবর, দুর্বাঘাস, ধান ও ফুল কুলোয় নিয়ে ছিটানো হয়। এরপর শরীর থেকে সমস্ত বন্ধন, গহনাদি, অর্থকড়ি সরিয়ে ফেলা হয়। জাং বাহা সংগ্রহ করে, চিতা বা কবরের চারিদিকে তিন পাঁক ঘরিয়ে কবরে নামানো হয়।
চিতা বা কবরে মৃতের বড় ছেলে মুখাগ্নি করেন। তারপর একটি মুরগির চোখের মধ্যে দিয়ে মহুয়া গাছের একটা ডাল ঢুকিয়ে উৎসর্গ করা হয় এবং চিতার চারপাশে খুটি গুলোর একটিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এ সম্পর্কে ধারণাটি হলো– উৎসর্গীকৃত মুরগি মৃত ব্যক্তিকে পরকালে পথ দেখাবে। কবর দেওয়ার ক্ষেত্রেও একই রীতি। প্রথমে বাড়ির লোকেরা, তারপর সবাই বাম হাতে তিনবার মাটি দেয়। কবর খোঁড়ার প্রথম তিন চাপা মাটি সব শেষে দেওয়া হয়। গোর খোড়কদের শেষজন কলসি ও কুলোতে তিনচাপা মাটি দিয়ে ভেঙে ফেলে কবর দেওয়ার কাজ সম্পন্ন করেন।
থেকে তোমাকে বিদায় দিলাম। বাতাসের মতো চলে যাও, আগুনের শিখার মতো জ্বলে ওঠো। আমরা তোমাকে কাঠ ও আগুন দিয়েছি। ভস্মীভূত হয়ে চলে যাও।(আর্চার ১৯৭৪:৩৩০)
অন্তিম অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় মৃতের পরিবার এই কথাগুলো বলে মৃত আত্মাকে আহ্বান করে– “আমাদের শান্তিতে রেখো। আমাদের কষ্ট দিও না। আমাদের কাছ থেকে কিছু কেড়ে নিও না।
শবদাহ ও কবরের কাজ শেষে সকলেই স্নান করেন। তারপর গ্রামে প্রবেশমুখে মুরগি বলি ও আগুন মাড়িয়ে সকলে বাড়িতে চলে আসেন। তারা মনে করেন, মৃতদেহ অশুভ আত্মাদের আকর্ষণ করে যা জীবিতদের ক্ষতি করতে পারে। এই ধরনের অশুভ আত্মাদের প্রতিহত করার জন্য সাঁওতালরা মৃতের বাড়ি থেকে প্রেতাত্মা তাড়ানোর জন্য একজন দৈবজ্ঞ-পুরোহিতকে নিযুক্ত করে। যদি মৃত্যুটি আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত হয়, তবে এই দৈবজ্ঞ-পুরোহিত আকস্মিক মৃত্যুর কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন। তিনি যেকোনো অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সুরক্ষার জন্য মঙ্গলময় বোঙা-এর কৃপা লাভের উদ্দেশ্যে একটি কালো মুরগি বলি দেন।
অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, দেহের মধ্যে যে আত্মিক সত্তা থাকে। এগুলোর মধ্যে চুল ও কঙ্কালকেই অমর বলে মনে করা হয়। সেই আত্মিক সত্তায় জাং বাহাকে জীবন্ত করে তোলে। এই ঘটনাটি মৃতের চূড়ান্ত রূপান্তরকে চিহ্নিত করে, যা তাকে এক প্রকার “আত্মা” থেকে পূর্বপুরুষে পরিণত করে।
জাং বাহাকে নিয়ে পরবর্তী ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি গুলো শুরু হয়। তিক্ত গান ও বিলাপ আকারে পাওয়া তথ্যগুলো নিচে দেওয়া হল-
উঁচু পাহাড়ের উপর
শকুনেরা উড়ছে,
আমাকে আমার বাবার হাড় দেখাও।
ওহে শকুন,
আমার কানের সোনা নাও
আমাকে আমার বাবার হাড় দেখাও।
(আর্চার ১৯৭৪:৩৩১)
সাঁওতালদের মৃত্যুর পর মৃতের শেষকৃত্য, সৎকার এবং পরবর্তী শোক ও স্মরণ অনুষ্ঠান গুলো তাদের ধারাবাহিক জীবন ও মৃত্যুর ধারণা উপস্থাপনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে।
জাং বাহা সংগ্রহ সাঁওতালদের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের একটি প্রথাগত ধর্মীয় অনুশীলন। প্রাথমিক অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান। মৃতের নখ ও চুলের সামান্য অংশই জাং বাহা। মতান্তরে, কপালের শক্ত হাড়, দাহের পরে সংগ্রহ করা হয়। জাং বাহা সাধারণত দেহকে কবরস্থ করার আগে বা শবদাহের পর সংগ্রহ করা হয়। সাঁওতালরা মনে করে নখ এবং চুল হলো হাড়ের পরিস্ফুটিত ফুল। এই চেতনাগত ধারণাটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানের প্রেক্ষাপটে পরজন্মের এক গভীর বাহক হয়ে ওঠে।
জাং বাহা সংগ্রহের পর এগুলোকে একটি কাপড়ের টুকরোয় গিঁট দেওয়া হয়। মৃতকে কবর দেওয়া হলে, জাং বাহাকে মাটিতে আবৃত করে তিনটি গুলি বানিয়ে ছোট্ট একটি চিতায় পোড়ানো হয়। এরপর গুলি গুলোকে একটি কাপড়ের টুকরোয় গিঁট দিয়ে মৃতের প্রথম পুত্র সন্তানের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তিনি এগুলোকে মুষ্টিবদ্ধ হাতে ধরে রাখেন, এরপর বাড়িতে এনে উপস্থিত সকল মহিলারা সেগুলোর উপর কিছু তেল, হলুদ এবং ছাই মেশানো জল ঢালেন। এ কাজ সম্পন্ন হলে হাড়গুলোকে বিন্না ঘাসের গোড়ায় পুতে রাখা হয়। অথবা প্রায়শই বাড়ির ছাদের নিচে কড়িকাঠে, ধোঁয়ার নাগালের বাইরে সংরক্ষণ করা হয়।
‘জাং বাহা বিসর্জনকে বলা হয় নৗয়-তে-ইদি ( NAI-TE-IDI)। সংগৃহীত হাড় বা জাং বাহা নদীতে বিসর্জনের জন্য নিয়ে যাওয়াই নৗয়-তে-ইদি। সংরক্ষিত হাড়কে প্রথাগত রীতি ও আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে খুঁজে বের করে বা খুঁড়ে বের করে নদীতে নিয়ে যাওয়া হয়। এটি সাঁওতাল সমাজের দ্বিতীয় মৃত্যু-অনুষ্ঠান। এর সাথে সম্পৃক্ত আচার গুলো গানের আকারে সমাজে প্রবাহমান রয়েছে–
‘ছ মাস, ন মাস’ কুখি মে রাখে লোম
মানাবির রে গুনাবির রে পুঁতা
লে যাব তেলকুপি ঘাট।
[ ওহে পুত্র! নয় মাস ছয় মাস আমি তোমাকে গর্ভে ধারণ করেছিলাম। তুমি যদি তোমার পিতা-মাতাকে ভালোবাস ও শ্রদ্ধা কর, মরার পরে দেহাবশেষ নিয়ে তেল কুপি ঘাটে নিয়ে যাও এবং বিসর্জন দাও ]
আরও কেউ জিজ্ঞেস করে;
‘না জানি তুস কুরে
না জানি পাস কুরে
মা’কে জো ছাড়ে আলি’
[ কারও যদি সন্দেহ হয় যে, সন্তান সত্যিই কি হাড় নদীতে বিসর্জন দিয়েছে নাকি ছাইয়ের পালায় বা নোংরা আবর্জনায় ফেলে দিয়েছে।]
সন্তান তখন উত্তর দেয়–
তুস কুরে না বাবা,
পাস কুরে না বাবা,
দামোদর ঘাট বাবা সিনান কুরি
একা ডুবে ডুবা লোম,
দুয়ে ডুবে ডুবা লোম,
তিনে ডুবে দেসে-হিরলৗ।
[ আমাকে দোষ দিবেন না, আমি তা কোথাও ফেলিনি, মায়ের দেহাবশেষ বা জাং বাহা আমি তেল কুপি ঘাটেই বিসর্জন দিয়েছি। নদীর জলে এক ডুবে নয়, দুই ডুবেও নয়, উপস্থিত সকলের সাথে তিন ডুবে বিসর্জন দিয়ে এসেছি। জল থেকে উঠে আসার সময় তাদের সাথে তিন বার ‘হিরলৗ মারাংবুরু’ ধ্বনিত করেছি]
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সম্পূর্ণ আচারকে এভাবেও বিভক্ত করা যায়—
১) মৃতদেহ কবর দেওয়া বা দাহ করা হয়, যা সাধারণত নদীর কাছে, মৃত্যুর দিনেই অথবা তার পরের দিন সম্পন্ন হয়। দাহের পর জাং বাহা তৈরির জন্য হাড় সংগ্রহ করা হয়।
২) প্রথম শুদ্ধিকরণ (তেল নাহান = আক্ষরিক অর্থে তেল স্নান) মৃত্যুর পাঁচ দিন পর অনুষ্ঠিত হয়। নদীর কূলে ঘাট তৈরি করে গোত্রের আদি পূর্বপুরুষ, পূর্বপুরুষ এবং মারাংবুরুকে পূজা করতে হয়।
৩) খাবার উৎসর্গ করা: মৃত ব্যক্তির জন্য প্রতি রাতে আঙ্গিনায় খাবার রাখা হয়।
৪) গৃহদেবতার উপাসনা, যা মৃত্যুর নয় দিন পর সম্পন্ন হয়।
৫) নদীতে হাড় বা জাং বাহা বিসর্জন, যা মৃত ব্যক্তি, তার জ্ঞাতি ভাই এবং বন্ধুদের অন্তিম শুদ্ধিকরণ। এই আচারটি মৃত্যুর কয়েক মাস বা এক বছর পর অনুষ্ঠিত হতে পারে।
সাঁওতাল পরিবারের কোনো মৃত্যু ঘটলে তার পরিবারকে অশুদ্ধ করে তোলে। বোঙাদের উদ্দেশ্যে বলিদান, চালের বিয়ার(হাঁড়িয়া) পান এবং বিবাহ উদযাপন অসম্ভব হয়ে পড়ে। বিঘ্নিত সামাজিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এর মাধ্যমে শুদ্ধিকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপরিউক্ত প্রেক্ষাপটে অশুদ্ধতার ধারণাটি মৃত ব্যক্তি এবং স্বয়ং মৃত্যুর দ্বারা সৃষ্ট ও আকর্ষিত বিপদের সাথে সম্পর্কিত। মৃত ব্যক্তি জীবিতদের জন্য একটি দুর্ভোগের সৃষ্টি করে এবং এই বিপদগুলো শুদ্ধ ও নিষ্ক্রিয় করা নিশ্চিত করার জন্য অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

