সহরায়: সাঁওতালদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব

Subas Murmu
By -
0


সহরায়: সাঁওতালদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব





ভূমিকা:
সহরায় সাঁওতালদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এই উৎসবের মধ্য দিয়ে কৃষি সরঞ্জাম ও গাবাদিপশুর সাথে সাঁওতালদের গভীর সম্পর্কের বিষয় উঠে আসে। বিবাহিত কন্যার বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসার আকুতি ও আনন্দ প্রকাশ পায় সহরায়ে। আত্মীয়-স্বজনের সমাগমে পাঁচদিনব্যাপী ধর্মীয় বিভিন্ন রীতিনীতি ও নাচ-গানের মাধ্যমে ব্যাপক আড়ম্বরভাবে সহরায় পালন হয়ে থাকে।

সময়:
সহরায় উৎসব হয়ে থাকে কার্তিক মাসের চাঁদ আকাশে থাকাকালীন বা কার্তিক চাঁতোতে। তাই সাঁওতালি বর্ষপুঞ্জিতে কার্তিক মাসকে ‘সহরায় বঙগা’ বা ‘সহরায় চাঁদো’ বলে। তবে ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক কারণে ভারতের কিছু অঞ্চল ও বাংলাদেশের সাঁওতালরা পৌষ মাসে ধান তোলা শেষ করার পর পৌষ মাসের চাঁদ থাকাকালীন বা পুস চাঁদোতে সহরায় পালন করে থাকে। গ্রাম প্রধান অর্থাৎ মৗঞ্জহিবাবা সংবাদ বাহক গডিৎ এর মাধ্যমে গ্রামের লোকজন ডেকে সহরায়ের দিনক্ষণ নির্ধারনের জন্য সভা করেন। গ্রামের সবাই মিলে নিজেদের সুবিধা মতো দিনক্ষণ নির্ধারন করে সহরায় পালন করেন।

সহরায়ের উৎপত্তি:
সাঁওতালদের ধর্ম সৗরিধরম এর ধর্মগ্রন্থ জমসিমবিন্তি এর মধ্যে সহরায় এর উৎপত্তি বিষয়ে বর্ণনা আছে। সেখানে দেখা যায়, সৃষ্টির পর পৃথিবীতে যখন মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় তখন তাদের খাদ্যের যোগান দিতে স্রষ্টা ঠাকুর-ঠাকরাণ প্রধান দেবতা মারাংবুরু এর মাধ্যমে মানুষের হাতে তুলে দেন চাষের সরঞ্জাম লাঙ্গল, জোয়াল, মই ইত্যাদি; হাল টানার জন্য গরু, মহিষ সাথে অন্যান্য গাবাদিপশু। এসব দিয়ে চাষাবাদ করে মানুষের খাদ্যের যোগান নিশ্চিত হয়। মানুষ সুখে বসবাস করতে থাকে। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা ধর্মের পথ ছেড়ে অধর্মের পথে যেতে লাগলো। কৃষি সরঞ্জামের যত্ন নেওয়া ভুলে যায়। গাবাদি পশুর প্রতি অবহেলা করতে থাকে। তাদের যত্ন না নিয়ে শুধু নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে থাকে। যা এক সময় গাবাদি পশুদের নির্যাতন পর্যায়ে চলে যায়।

এমন পরিস্থিতিতে গাবাদিপশুরা স্রষ্টার কাছে অভিযোগ জানায়। তাদের দুঃখ দুর্দশার কথা জানায়। স্রষ্টার কাছে তারা দাবি জানায়, তারা মানুষের সাথে আর থাকবে না। তাদের যেন স্বর্গে তুলে নেওয়া হয়। স্রষ্টা ঠাকুর গাবাদিপশুদের কথা শুনে মানুষের উপর অখুশি হন। তাই গাবাদিপশুদের স্বর্গে তুলে নেওয়ার কথা চিন্তা করেন। কিন্তু গাবাদি পশু না থাকলে তো চাষাবাদ হবে না। ফলে পৃথিবী থেকে ব্যাপক সংখ্যক মানুষ ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই সেই সময় স্রষ্টার নারী রূপ ঠাকরাণ এগিয়ে এসে ঠাকুরকে শান্ত করেন। মানুষকে সুধরানোর সুযোগ দিতে অনুরোধ করলেন। ঠাকুর শান্ত হলেন। মানুষকে সুযোগ দিলেন অধর্মের পথ থেকে ফিরে আসার; গাবাদিপশুদের যত্ন করার। মানুষ সেটা ঠিক মতো করছে কিনা দেখার জন্য স্রষ্টা নিজে যাবেন মর্তলোকে।

তখন ঠাকরাণ মারাংবুরুকে ডাকলেন। তাঁকে গাবাদিপশু ও ঠাকুরের কথপেকথন বিষয়ে জানালেন। মানুষকে ধর্মের পথে নিয়ে আসা ও গাবাদিপশুর যত্ন নেওয়ার জন্য মানুষের মধ্যে সহরায় উৎসবের প্রচলন করতে বলেন। সেই উৎসবে বাড়ির বিবাহিত কন্যা ও তাদের জামাইকে অবশ্যই দাওয়াত দিতে বললেন। কারণ তাদের রূপ ধরেই ঠাকুর-ঠাকরাণ সহরায় দেখতে আসবেন। কন্যা ও কন্যার বর খুশি হলেই ঠাকুর-ঠাকরাণ খুশি হবেন। মানব সভ্যতা টিকে থাকবে। এর অন্যথা হলে ধ্বংস হবে। ঠাকরাণের কথা মতোই মারাংবুরু পৃথিবীতে এসে মানুষদের বুঝালেন। সহরায় পালনের সকল নিয়ম তাদের শেখালেন। মানুষ তাদের পথপ্রদর্শক প্রধান দেবতা মারাংবুরু এর কথা মতো যথাযথ নিয়েমে সহরায় পালন করলো। ঠাকুর-ঠাকরাণ দেখে খুশি হলেন। টিকে থাকলো মানব সভ্যতা। মানুষ তথা হড়হপনের মাঝে প্রচলিত হলো সহরায়।





সহরায়ের পর্বগুলো:
সহরায় উৎসব পাঁচ দিনব্যাপী কয়েকটি পর্বে পালন করা হয়ে থাকে। পর্বগুলো নিচে আলোচনা করা হলো-

১. উম মাহা: সহরায়ের প্রথম দিনকে বলা উম মাহা। উম শব্দের বাংলা অর্থ করলে হয় ‘স্নান’। এই দিন বাড়ি, ঘর, কাপড়, কৃষি কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জাম পরিষ্কার করা হয়। গাবাদি পশুদের গোসল কারানো হয়। নিজেরাও স্নান করে পবিত্র হয়। তারপর যায় গট বঙ্গা করতে।

২. গট বঙ্গা: সহরায়ের উম মাহাতে গ্রামের সকল পুরুষ মানুষ গাবাদিপশুর চারণভূমিতে(গট টৗন্ডিতে) গিয়ে গট বঙ্গা করে। সেখানে গট বঙ্গার জন্য স্থান তৈরি করা হয়। যেটাকে বলা হয় বঙ্গা খন্ড। নায়কে বাবা সূর্যদয়ের দিকে মুখ করে বসে প্রথমে মুরগির দুটি ডিম পরিষ্কার করা স্থানে রাখেন। তার নিচে বাম থেকে ডানে যথাক্রমে মারাংবুরু, জাহের আয়ো, ধরম ও মড়ে ক তুরুয় ক এই বঙ্গা বা দেবতার নামে তিনটি বৃত্ত তৈরি করেন ময়দা দিয়ে। বৃত্তের মধ্যে একমুঠো আতপ চাউল রাখেন। এই তিনটি খন্ডে বাম দিকে থেকে প্রথমে মারাংবুরু নামে, তারপর জাহের আয়ো নামে এবং শেষে ধরম ও মড়ে ক তুরুয় ক নামে গ্রামের পক্ষ থেকে তিনটি মুরগি উৎসর্গ করা হয়। তারপর প্রতিটি পরিবার থেকে দান করা মুরগি, কবুতর প্রভৃতি উৎসর্গ করা হয়। নায়কের পাশে বসে অন্যরা এতে সামিল হন। উৎসর্গ করার সময় নায়কের সাথে সবাই মিলে এই বঙ্গাদের কাছে গাবাদিপশু, গ্রামের সব মানুষ ও আত্মীয় স্বজনদের সুস্থতা এবং সহরায়ের সফলতা প্রার্থনা করা হয়। উৎসর্গকৃত মুরগি, কবুতর প্রভৃতি সোড়ে করে গট টৗঁডিতে উপস্থিত সবাইকে প্রসাদ হিসেবে প্রদান করা হয়। গট টৗঁডিতে ভিন্ন জায়গায় কুডৗম নায়কে আর একটি খন্ড করেন। সেখানে সীমা সাড়ে নামে কালো মুরগি উৎসর্গ করা হয়। অপশক্তি ও মহামারি থেকে সবাইকে রক্ষা করার প্রার্থনা করেন। এই মুরগি কুডৗম নায়কে একাই সোড়ে করে খান।

বঙ্গা বা পূজার কাজ শেষ হলে নায়কে তার পূজার সরঞ্জাম কুলাতে তুলে নেন। ডিম দুটি সেখানেই রাখা থাকে। তারপর গ্রামের সব গরু মহিষকে খন্ডের উপর দিয়ে গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। যে গরু প্রথমে ডিম ভাঙবে তাকে চিহ্নিত করা হয় সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে। গরুর মালিককে সৌভাগ্যবান মনে করা হয়। রাখাল বা রাখালের অনুপস্থিতিতে গরুর মালিকের ছেলেকে জগমৗঞ্জহি ঘাড়ে করে মৗঞ্জহি বাবার কাছে নিয়ে আসেন। তারপর রাখালের গায়ে ও গরু চরানোর পান্ঠিতে তৈল মাখানো হয়। গরুর মালিক খুশি হয়ে আগামী সহরায়ে গট টৗন্ডিতে কিছু খাওয়ানোর(অধিকাংশ ক্ষেত্রে হৗন্ডি খাওয়ানোর) ব্যবস্থা করেন। তারপর সবাই নাচ-গান করতে করতে গ্রামে চলে আসে। সবাই নাচ-গান করতে করতে নায়কে, মৗঞ্জহি, পারানিক, জগমৗঞ্জহি ও গডিতের বাড়িতে যায়। সেখানে তাদের কিছু আপ্যায়ন করা হয়।

বিকালে গ্রামের সবাই নিজ নিজ গোয়াল ঘরে গাবাদিপশুর মাথায় তৈল সিঁদুর মাখিয়ে দেয়। সন্ধ্যায় মহিলারা কুলাতে করে বাতি জ্বালিয়ে ধুবি ঘাস, ধান ও আতপ চাউল ছিটিয়ে গাবাদিপশুদের আরতি করে। বন্দনা করে। তারপর গ্রামের যুবক যুবতীরা বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক ক্রিয়কলাপের মাধ্যমে সারারাত গাবাদিপশুদের জাগিয়ে রাখে।

৩. বঙ্গা মাহা: সহরায়ের দ্বিতীয় দিনকে বলা হয় বঙ্গা মাহা। এই দিন সবার আত্মীয়-স্বজনের সমাগম ঘটে। প্রতিটি বাড়িতে হাপড়াম(পূর্বপুরুষ) ও মারাংবুরুর নামে বঙ্গা করা হয়। বিবাহিত মেয়েরাও শ্বশুর বাড়ি থেকে হাপড়াম ও মারাংবুরুর নামে উৎসর্গ করার জন্য কিছু নিয়ে আসে। সেটাও এই দিন বঙ্গা করা হয়। বিকালে গ্রামের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত সবাই মিলে নাচ-গান করে। সেদিন গাবাদি পশুদের বিশ্রাম বার।

৪. খুন্টৗউ মাহা: সহরায়ের তৃতীয় দিনকে বলা হয় খুন্টৗউ মাহা। এই দিন সকালে গোওয়াল ঘর থেকে গাবাদিপশু বের করার আগে বা আগের দিন রাতেই গোওয়াল ঘরের দরজায় ময়দা মেশানো পানি দিয়ে খন্ড তৈরি করা হয়। অনেকে বাড়ির বাইরে রাস্তা পর্যন্ত খন্ড ও বিভিন্ন আলপনা করে। এই খন্ড প্রতিটি পৗরিস বা পদবী ও উপ-পদবীর জন্য ভিন্ন হয়। খুন্টৗউ মাহা সকালে গাবাদিপশুদের তৈল সিঁদুর মাখানো হয়। ধানসহ ধানের গাছ দিয়ে বানানো মালা, তেল পিঠা দিয়ে সাজানো হয়। জগমৗঞ্জহির দিকনির্দেশনায় যুবকরা মৗঞ্জহি, পারানিক, জগমৗঞ্জহি, নায়কে ও গডেতের বাড়ির বাইরে খুটি বসায়। সেখানে গাবাদিপশুদের বের করে বাঁধা হয়। অন্যরা নিজ দায়িত্বে বাড়ির বাইরে খুটি বসিয়ে গাবাদিপশু বাঁধে। তারপর বাড়ির মহিলারা আগের মতোই গাবাদি পশুদের আরতি করে। আর গ্রামের যুবকরা মাদল নাগরা বাজিয়ে নাচগান করে এবং গাবাদিপশুদের সাথে মজা করে ও উত্তেজিত করে।

৫. জালে মাহা: সহরায়ের চতুর্থ দিন জালে মাহা। এই দিন সবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে নাচ-গান করা হয়। সব বাড়িতেই আপ্যায়ন করা হয়।

উপরে উল্লেখিত চারটি দিনের বাইরে আর একটি দিন হলো দিশৗম খুন্টৗউ মাহা। এটা খুন্টৗউ মাহার পরের দিন পালন করা হয়। এই দিন গ্রামের সব গরু-মহিষ চারণভূমিতে এক জায়গায় জড়ো করে খুন্টৗউ মাহার মতোই বিভিন্ন ক্রিয়াকর্ম ও আনন্দ করা হয়। ফলে জালে মাহা পঞ্চম দিন হিসেবে পালন করা হয়। তবে অনেক গ্রামেরই দিশৗম খুন্টৗউ মাহা পালন করা হয় না। বিশেষ করে যেসব গ্রামে পৌষ মাসে সহরায় পালন করা হয় সেসব গ্রামে দিশৗম খুন্টৗউ এর পরিবর্তে সাকরাত’কে পঞ্চম দিন হিসেবে পালন করা হয়। তবে সাকরাত সহরায়ের অংশ নয়। পৌষ সংক্রান্তিকে সাঁওতালরা সাকরাত নামে নিজস্ব ধর্মীয় রীতিতে পালন করে।

বিশ্লেষণ:
আমরা যদি গভীরভাবে সহরায় উৎসবকে দেখি, তাহলে দেখতে পাবো- সহরায় উৎসব শুধু সাঁওতালদের ধর্মীয় উৎসব নয়, এই উৎসবের সাথে জড়িয়ে আছে মানব সভ্যতার ইতিহাস। বাড়তি মানুষের খাদ্য যোগান দিতে প্রথম যে বিপ্লব ঘটেছিল তা হলো কৃষি বিপ্লব। যার ইতিহাস সহরায়ের মধ্যে দেখতে পাই, যখন মারাংবুরু মানুষের হাতে চাষের লাঙল, গরু, মহিষ ইত্যাদি তুলে দেন। কৃষি বিপ্লব যদি না ঘটতো মানব সভ্যতা আজকের যুগে আসতে পারতো না। এখনো যদি আমরা কৃষির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করি- মানব সভ্যতা ধ্বংস হবে। তাই সহরায় আমাদের প্রতি বছর মনে করিয়ে দেয় কৃষি ও গাবাদি পশুর সাথে আমাদের গভীর সম্পর্কের কথা। সেই সম্পর্ক যেন আমরা ছিন্ন না করি। অবহেলা না করি। যত্নসহকারে বজায় রাখি।

সহরায় পিতা কন্যার গভীর সম্পর্কের বিষয় তুলে ধরে। সহরায় মনে করে দেয় ভাই-বোনের ভালোবাসার দৃঢ় বন্ধনের কথা। বোনের প্রতি ভাইয়ের দায়িত্বের কথা। সাঁওতাল সমাজে সামাজিক কারণেই কন্যাকে পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকার দেওয়া হয় না। যার জন্য পুত্রের প্রতি পিতার আদেশ থাকে কন্যার বিপদে আপদে পাশে থাকার। প্রতিটি উৎসব অনুষ্ঠানে যেন মেয়ে ও মেয়ের জামাইকে দাওয়াত দেওয়া হয়। যেন যথাযথ সম্মান করা হয়। পুত্ররা যুগযুগ ধরে এই আদেশ পালন করে আসছে। যার জন্যই সাঁওতাল সমাজে ভাই বোনের সম্পর্ক আজও দৃঢ়। আর যারা এই নিয়মের বাইরে গেছে, সে সব ভাই বোনের সম্পর্কে দেখা গেছে ফাটল।

সহরায়ের মধ্য দিয়ে আবারও সামনে চলে আসে মহাবিশ্ব, পৃথিবী ও মানুষ সৃষ্টির ইতিহাস। সাঁওতালদের ধর্মে আছে, প্রথম মানব মানবীর জন্ম হয়েছিল হাঁস ও হাঁসলি নামক পাখির ডিম থেকে। যার জন্য গট টৗন্ডিতে রাখা হয় দুটি ডিম। হাঁস-হাঁসলি থেকে মানব সৃষ্টি- বিজ্ঞানের বিবর্তনবাদের চিত্র তুলে ধরে। গট টৗন্ডিতে তৈরি করা গোলাকার খন্ড আমাদের মনে করিয়ে দেয় গোলাকার পৃথিবীর কথা। গোলাকার খন্ডের মাঝে একমুঠো চাউল আমাদের মনে করিয়ে দেয় একটি বিন্দুর বিস্ফোরণ বা বিগব্যাঙ থেকে সৃষ্টি হওয়া চারদিক প্রসারমান মহাবিশ্বের কথা। বর্তমান বিজ্ঞানের সাথে এসবের মিল নিছক কাকতালিয় নয়। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে চলে আসা এই রীতি আমাদের প্রমাণ দেয় প্রাচীন সাঁওতালরা ধর্মের সাথে জড়িয়ে জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা করেছে। তবে অনেক জায়গায় ভিন্ন ধরনের খন্ডও দেখা যায়। কিন্তু সেগুলো কেন ভিন্ন রকম তার যথাযথ ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। হয়তো বহু যুগ ধরে সাঁওতালদের বিছিন্নভাবে বসবাসের কারণে এই ভিন্নতা বা কিছু ক্ষেত্রে বিকৃতির সৃষ্টি হয়েছে।

একজন মানুষের আজীবন তার পূর্বপুরুষের কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিৎ। কারণ পূর্বপুরুষ ছাড়া তার অস্তিত্ব থাকতো না। স্রষ্টা প্রথম মানব-মানবীর মাঝে যে প্রাণের সঞ্চার করেছিলেন, তা পূর্বপুরুষের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আমাদের শরীরে এসেছে। যে প্রাণ হলো স্রষ্টার অংশ। যেহেতু স্রষ্টাকে আমরা দেখিনি, তাই পূর্বপুরুষদের প্রতি ‍কৃতজ্ঞতা ও পূজার মধ্য দিয়ে আমরা মূলত স্রষ্টার সাথে সংযোগ সৃষ্টি করি। তাই সাঁওতালরা সহরায়সহ সকল উৎসব অনুষ্ঠানে মারাংবুরু ও পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে হৗন্ডি ও বিভিন্ন খাবার উৎসর্গ করে। তারপর নিজেরা খায়।

প্রতিটি গ্রাম নিজেদের সুবিধাজনক সময়ে সহরায় বা অন্য উৎসবও পালন করে। যার জন্য ভিন্ন ভিন্ন গ্রামে সহরায়/উৎসব কয়েকদিন আগে পরে হয়ে থাকে। এই ভিন্নতার জন্যই সাঁওতাল সমাজেে আত্মীয়তার বন্ধন দৃঢ় হয়ে আছে। কন্যা বরের গ্রামের সহরায় শুরুর আগে বা শেষ করে বাবার বাড়ি বা ভাইয়ের বাড়ি বেড়াতে যেতে পারছে। তার ছোট বেলার খেলার সাথীদের সাথে দেখা হবে। সবাই মিলে নাচ-গান আনন্দ হবে। এই যে বাবার সাথে ভাইয়ের সাথে খেলার সাথীদের সাথে আনন্দে সামিল হওয়া- এটা সম্ভব হয়েছে উৎসবরে দিনের ভিন্নতর কারণে। তাছাড়া চাঁদ দেখে সহরায় পালন প্রকৃতির সাথে সাঁওতালের চিরন্তন সম্পর্ক প্রকাশ করে।

তবে সাঁওতাল সমাজের অনেকেই সরকারি ছুটির জন্য একই দিনে সহরায়/উৎসব করার মত দিয়ে থাকেন। যদি সেটা হয়, তাহলে সাঁওতাল সমাজে পেড়া হড়ঃ বলে যে অসাধারণ বিষয় আছে সেটা নষ্ট হবে। আত্মীয়তার বন্ধর ভঙ্গুর হবে। সামাজিক ও ধর্মীয় অনেক বিষয়ে সংকট দেখা দিবে। এ বিষয়ে সমাধান হতে পারে সরকারকে জানানো যে, সাঁওতালরা কার্তিক/পৌষ মাসে সহরায় করে। এ সময় যেন সাঁওতাল কর্মচারীকে তার সুবিধা মতো উৎসব উপলক্ষে ছুটি দেয়। তাহলেই সরকারের ক্যালেন্ডারে কার্তিক/পৌষ মাস সহরায় উপলক্ষ্যে চিহ্নিত থাকবে।

উপসংহার:
সবশেষে এটাই বলা যায় সহরায় সাঁওতালদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ধর্ম ও সংস্কৃতি প্রকাশ করে। সাঁওতাল হিসেবে পরিচয় তুলে ধরে। যেখানে মানব সভ্যতা টিকে থাকার দর্শন পাওয়া যায়। হয়তো সময়ের কারণে সহরায় পালনে বিভিন্ন জায়গায় কিছু ভিন্নতা রয়েছে, তবে সহরায়ের মূল বিষয় এখনো বজায় রয়েছে। তবে তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে সারা পৃথিবীর সাঁওতালদের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি হচ্ছে। তাই একটা সময় সেই কিছু ভিন্নতাও দূরিভুত হবে। সারা পৃথিবীর সাঁওতাল আরও দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধে হবে। আর যারা সহরায় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, তারা হারাবে সাঁওতাল পরিচয়।


তথ্যসূত্র:
১. জমসিম বিন্তি - সোমাই কিস্কু
২. The culture and philosophy of Santal - Bhogla Soren
৩. হড়কোরেন মারে হাপড়ামকো রেয়াঃ কাথা - কলেয়ান হাড়াম
৪. জাহের বঁগা সান্তাড় ক - রামেশ্বর মুরমু(অৗদিম সান্তাড়)
৫. ঈশরড় - সাধু রামচাঁদ মুরমু
৬. Santhali a natural language - Dr. P. C. Hembram

Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)
3/related/default