ভূমিকম্প: সাঁওতালদের মিথলজি ও বিজ্ঞান
![]() |
কচ্ছপের পিঠে মাটি ফেলছে কেঁচো। |
সাঁওতালদের মিথলজিতে ভূমিকম্প:
সাঁওতালদের মিথলজি অনুযায়ী বর্তমান স্থলভাগ সৃষ্টির পূর্বে পুরোটাই পানিতে নিমজ্জিত ছিল। মাটি ছিল পানির নিচে। সেই মাটি তুলে এনে স্থলভাগ বানানোর পরিকল্পনা করেন ঠৗকুর ও ঠৗকরাণ, যারা হলেন সাঁওতালদের ধর্মমতে স্রষ্টার পুরুষ ও নারী রূপ। তাঁরা স্থলভাগ তৈরির দায়িত্ব দেন সাঁওতালদের প্রধান দেবতা মারাংবুরু’কে। মারাংবুরু তাঁদের আদেশ অনুযায়ী স্থলভাগ তৈরির কাজ শুরু করলেন।
স্থলভাগ তৈরির জন্য মারাংবুরু প্রথমে তায়াং(কুমির)কে ডাকলেন। কুমিরকে বললেন পানির নিচ থেকে মাটি তুলে আনার জন্য। কুমির মাটি তুলে আনলেন ঠিকই, কিন্তু পানির উপরে সেটা রাখতেই ভেসে চেলে গেল। কুমির স্থলভাগ তৈরি করতে পারলো না। তারপর মারাংবুরু ডাকলেন ইচৗঃ হাকো(চিংড়ি মাছ)কে। চিংড়ি মাছও একইভাবে মাটি আনলো। কিন্তু সেটিও ভেসে চলে গেল। সেও স্থলভাগ তৈরি করতে পারলো না। তারপর মারাংবুরু বোয়াড় হাকো(বোয়াল মাছ)কে ডাকলেন। সেও একইভাবে স্থলভাগ তৈরি করতে পারলো না। তারপর মারাংবুরু ডাকলেন ধিরি কাটকম(রাজ কাঁকড়া)কে। সেও একইভাবে ব্যর্থ হলো।
ফলে মারাংবুরু ভিন্ন পরিকল্পনা নিলেন। মারাংবুরু হরঅ রাজ(কচ্ছপ রাজ)কে ডাকলেন। কচ্ছপকে পানির উপর ভেসে থাকতে বললেন। চারদিকে চারটি খুঁটিতে সোনার শেকলে বাঁধা হলো কচ্ছপের পা।
তখন কচ্ছপ বললো, “ মহারাজ, আমার পা তো বেঁধে দিলেন। এখতো আমি চলাফেরা করতে পারবো না। তাহলে আমার খাবার পাবো কীভাবে?”
তখন মারাংবুরু কচ্ছপকে বললেন, “চিন্তা করো না আমি তোমার খাবারের ব্যবস্থা করেছি। তোমার মুখের সামনে চারটি ফুটো থাকবে, যেটি পৃথিবীর স্থলভাগ থেকে আসবে। পৃথিবীর যেকেউ যখনই কিছু খাবে, তখনই তোমাকে স্মরণ করে কিছু খাবার মাটিতে ফেলবে। সে খাবার এই চারটি ফুটো দিয়ে তোমার মুখে পৌঁছাবে। তুমি সেটা খেয়ে বেঁচে থাকবে।”
এর জন্যই দেখা যায় সাঁওতালরা কোন খাবার খাওয়ার আগে কিছু অংশ মাটিতে উৎসর্গ করে।
কচ্ছপ বললো, “তা তো ঠিক আছে মহারাজ। কিন্তু আমি যদি ক্লান্ত হয়ে যাই, তখন কী করবো?
তখন মারাংবুরু কচ্ছপের একটি পা খুলে দিলেন। আর বললেন, “এই এক পা খুলে দিলাম। এটা নড়াচড়া করলেই তোমার ক্লান্তি দূর হবে।”
এ জন্যই কচ্ছপ যখন ক্লান্ত হয়ে পা নড়াচড়া করে তখনই ভূমিকম্প হয়।
তারপর কচ্ছপের পিঠে সোনার থালা স্থাপন করা হলো।
এরপর ডাকা হলো কেঁচো রাজকে। মারাংবুরু তাঁকে পানির নিচের মাটি খেয়ে সোনার থালাতে মল ত্যাগের মাধ্যমে স্থলভাগ তৈরি করতে বললেন। যেই কথা সেই কাজ। কেঁচো পানির নিচের মাটি তুলে সোনার থালাতে রাখতে লাগলো। তারপর মারাংবুরু মই দিয়ে সমান করলেন। যেসব জায়গা সমান হলো সেটা হলো সমতল। আর যেসব জায়গা সমান হলো না সেগুলো হলো পহাড়, পর্বত।
![]() |
| ভূমিকম্প |
ভূমিকম্পের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা:
বহু বছর আগে পৃথিবীর সব স্থলভাগ একত্রে ছিল। পৃথিবীর উপরিভাগে কতগুলো অনমনীয় প্লেটের সমন্বয়ে গঠিত বলে ধীরে ধীরে তারা আলাদা হয়ে গেছে। এই প্লেটগুলোকেই বিজ্ঞানীরা বলেন টেকটোনিক প্লেট। আমাদের ভূ -পৃষ্ঠ অনেকগুলো প্লেট-এর সমন্বয়ে গঠিত। টেকটোনিক প্লেটগুলো একে–অপরের সঙ্গে পাশাপাশি লেগে থাকে। কোনো কারণে এগুলোর নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ হলেই তৈরি হয় শক্তি। এই শক্তি সিসমিক তরঙ্গ আকারে ছড়িয়ে পড়ে। যদি তরঙ্গ শক্তিশালী হয়, তাহলে সেটি পৃথিবীর উপরিতলে এসে পৌঁছায়। আর তখনো যদি যথেষ্ট শক্তি থাকে, তাহলে সেটা ভূত্বককে কাঁপিয়ে তোলে। এই কাঁপুনিই মূলত ভূমিকম্প। প্লেটগুলোর নিচেই থাকে ভূ-অভ্যন্তরের সকল গলিত পদার্থ। কোনও প্রাকৃতিক কারণে এই গলিত পদার্থগুলোর স্থানচ্যুতি ঘটলে প্লেটগুলোরও কিছুটা স্থানচ্যুতি ঘটে। এ কারণে একটি প্লেটের কোনও অংশ অপর প্লেটের তলায় ঢুকে যায়, যার ফলে ভূমিতে কম্পন সৃষ্টি হয়। আর এই কম্পনই ভূমিকম্প রূপে আমাদের নিকট আবির্ভূত হয়।
তথ্য সূত্র:
১. জমসিম বিন্তি - সোমাই কিস্কু
২. The culture and philosophy of Santal - Bhogla Soren
৩. হড়কোরেন মারে হাপড়ামকো রেয়াঃ কাথা - কলেয়ান হাড়াম
৪. হড় হপন সান্তাল ইতিহাস - যহন হাঁসদা, জুলিয়ান টুডু, জি. যনতা
৫. জাহের বঁগা সান্তাড় ক - রামেশ্বর মুরমু(অৗদিম সান্তাড়)
৬ᱹ ইন্টারনেট

