সান্তালদের উপাসনা ধর্মের সংক্ষিপ্ত পরিচয়

Subas Murmu
By -
0

অনেকেই বলে থাকেন যে সান্তালদের ধর্ম নেই। এমনকি অনেক সান্তালও জানে না তাদের আচারিত ধর্ম আছে। তবে আপনি যদি সান্তাল সমাজকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেন। তাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বিশ্লেষণ করেন। তাহলে দেখতে পাবেন সান্তাল বহু প্রাচীন কাল থেকেই নিজদের ধর্ম পালন করে এসেছে। এখনো পালন করছে। তাহলে প্রশ্ন উঠে যে, তবে কেন অনেকের ধারণা সান্তালদের ধর্ম নেই? বা অনেক সান্তালকেও জিজ্ঞেস করলে নিজের ধর্ম সম্পর্কে কেন সুস্পষ্ট কিছু বলতে পারেনা।

এর কারণ হচ্ছে সান্তাল বহুকাল থেকে নিজেদের ধর্ম পালন করে আসলেও সেই ধর্মের যে একটা নাম লাগে এটা তারা বুঝতে পারে নি অথবা প্রয়োজন মনে করে নি। তাই কোন সান্তালকে যদি আপনি জিজ্ঞেস করেন, আপনার ধর্ম কী? বা আপনার ধর্মের নাম কী? তাহলে সে মুশকিলে পড়ে যায় কী উত্তর দিবে। অনেকে নিজেদের পূজা আচারের সাথে হিন্দুদের সামান্য মিল দেখে বলে থাকে সান্তালদের ধর্ম হিন্দু বা সনাতন। কিন্তু এটা ঠিক নয়।

আর সান্তালদের ধর্মের এই নাম না থাকাকে কাজে লাগিয়েছে ধর্ম ব্যবসায়ীরা। তারা সান্তালদের বুঝায় তোমাদের ধর্ম নেই। ধর্ম থাকলে তার নাম বলতে পারছ না কেন? এভাবে ধর্মের নাম না থাকাকে তাদের দুর্বলতা বানিয় ধর্মান্তরিত করে। যারা ধর্মান্তরিত হলো না তাদের বেদিন (ধর্মহীন) বলা শুরু করে।


ধর্ম বলতে যদি আমরা মানুষের ধর্মের কথা বলি বা মানবতার কথা বলি। তাহলে এটা প্রায় সবার কাছেই আছে। মানুষের এই ধর্মের জন্য  ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দরকার নেই।  কিন্তু সাধারণত আমরা ধর্ম বলতে উপাসনা ধর্মকে বুঝিয়ে থাকি। অন্যদের মত সান্তালদেরও উপাসনা ধর্ম ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আছে। সৃষ্টিকর্তা ও দেবদেবী(বঙ্গা)ও আছে। চলুন সান্তালদের ধর্মের সংক্ষিপ্ত পরিচয় জানি।


সান্তালরা স্রষ্টাকে ঠাকুর জিউ আর ঠাকুরান নামে দুজনকে মানে। এরাই সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা। তাদের প্রতিরূপ হিসেবে সূর্য দেবতা বা চান্দো বাবাকে মান্য করা হয়। মারাং বুরু হচ্ছেন সান্তালদের প্রধান দেবতা(বোঙা)। মারাঙ বুরুই সান্তালদের জন্ম থেকে মৃত্যুর সকল কর্ম শিখিয়েছেন। তার সাথে জাহের আয়ো বা জাহের বুডি, ধরম এবং মোড়ে কো, তরয় কো নামে দেবতাও আছেন। সান্তালদের প্রধান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান জাহের থান। এখানেই এদের পূজা করা হয়।


এর পরে যে প্রতিষ্ঠান আছে সেটা ধর্মীয় ও সামাজিক উভয়। তা হলো মাঞ্জহি থান। এখানে যে কোন কাজের শুভ কামনা করে মাঞ্জহি বংগা (দেবতা) কে পূজা দেওয়া হয়ে থাকে। মাঞ্জহি বঙা বলতে ঠাকুরকে ও গ্রামের প্রথম মাঞ্জহি থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত মৃত সকল মাঞ্জহিকে বুঝায়।


সান্তালদের গ্রামে বা নিজ বাড়িতে কোন অনুষ্ঠান হলেই তারা নিজের পূর্বপুরুষের উদ্দেশ্যে বাড়ির ভিতরে হান্ডি চডর করে স্মরণ করে। এটাও তাদের ধর্মীয় একটি অংশ।


এগুলোই হলো সান্তালদের ধর্মের সংক্ষিপ্ত পরিচয়। এই ধর্মের কোন নাম ছিলনা। তবে অন্য ধর্ম গুলোর পাশাপাশি অবস্থান কারণে সান্তালরাও তাদের ধর্মের নামের প্রয়োজন অনুভব করে। সেই থেকেই বিভিন্ন জন বিভিন্ন নামে বলতে থাকেন। সারি ধরম, হড় ধরম, মারে ধরম, জাহের ধরম, সার্না ধরম ইত্যাদি। উল্লেখ্য বেদীন ধরম বলে কোন ধর্ম নেই। এটা সান্তালদের ধর্মহীন ও অপমান করার জন্য ধর্মব্যবসায়ীদের প্রদত্ত শব্দ। তাছাড়া সান্তালদের ধর্মের নাম সারি ধরম ও সারণা ধরম এই দুটো নাম নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে সান্তালদের ধর্মের নাম "সারি ধরম" ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাচ্ছে। এই নামকেই সবাই গ্রহণ করতে আগ্রহী হচ্ছে।

সব শেষে এটাই বলতে চাই। সান্তালদের ধর্মের নাম নিয়ে বিতর্ক ও প্রশ্ন থাকলেও। সান্তালদের নিজস্ব ধর্ম আছে বা ছিলো এটা নিয়ে বিতর্কের কোন সুযোগ নেই।



Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)
3/related/default