সাঁওতালদের ধর্মের নাম ও ধর্মগ্রন্থ প্রয়োজন হলো কেন?
সাঁওতালদের ধর্মও সেই রকমই ছিল। যুগযুগ ধরে সাঁওতালরা নিজেদের ধর্ম পালন করে আসলেও কখনই ভাবেনি বিশ্বাস বা ধর্মের নাম লাগে। ধর্ম তো বিশ্বাসের জিনিস, তার আবার নাম কী! ধর্মগ্রন্থ বিষয়েও সাঁওতালদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো ভিন্ন। সাঁওতালদের ধর্ম ও রীতিনীতির বিষয়গুলো মৌখিকভাবে চলে এসেছে। তারা বিশ্বাস করতো সেগুলো লিখে রাখার চেয়ে অন্তরে ধারণ করার মধ্যেই ধর্মের যথার্থতা বজায় থাকে। তাই ধর্মগ্রন্থ লেখার প্রয়োজনও তারা মনে করেনি।
কিন্তু পৃথিবীর প্রভাবশালী ধর্মগুলো যখন নিজেদের ধর্মের ব্রান্ডিং নাম নিয়ে সাঁওতাদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে, ধর্মগ্রন্থ দেখিয়ে ধর্মের অস্তিত্ব প্রকাশ করতে থাকে, তখন সাঁওতালরা মুশকিলে পড়ে যায়। সাঁওতালদের প্রশ্ন করা হয়, তোমাদের ধর্মের নাম কী? তোমাদের ধর্মগ্রন্থের নাম কী? সাঁওতালরা উত্তর দিতে পারে না। তারা বুঝতে পারে না- ধর্মের নাম কীভাবে হয়! ধর্মগ্রন্থ কেন দরকার! বর্তমানেও কিছু সাঁওতালকে জিজ্ঞেস করলে ঠিক মতো বলতে পারবে না তার ধর্মের নাম; ধর্মগ্রন্থের নাম। ফলে প্রভাশালী ধর্মের মানুষগুলো ধরে নেয়- সাঁওতালদের ধর্ম নেই। ধর্মগ্রন্থ নেই। ধর্ম বা দ্বীন নেই বলেই সাঁওতালদের তারা বেদ্বীন লোক বলে গণ্য করে। আর যারা তাদের প্রভাবে ধর্মান্তরিত হয় তাদের ঐ ধর্মানুসারী
সাঁওতাল বলে গণ্য করা হয়। এভাবে মূলস্রোতের সাঁওতালরা হয়ে যায় বেদ্বীন সাঁওতাল বা ধর্মহীন সাঁওতাল।
এই সুযোগে সাঁওতালদের প্রভাবিত করতে ধর্মব্যবসায়ীদের এজন্টরা সাঁওতালদের ধর্মকে বেদ্বীন ধর্ম বলে প্রচার করতে থাকে। তার পক্ষে বিভিন্ন উদ্ভট যুক্তি দাঁড় করায়। আবার সুযোগ পেলে তারা বলে, বেদ্বীন সাঁওতালদের ধর্মের ঠিক নাই। সাঁওতালদের বিশ্বাসকে কুসংস্কার হিসেবে উপস্থাপন করতে লাগলো। সেই সাথে তারা প্রচার করতে থাকে ধর্মহীনরা ঘৃণ্য মানুষ। অপবিত্র মানুষ। চলতে থাকে ধর্মান্তরের বিভিন্ন কৌশল। কেউ তো ধর্মহীন বা ঘৃণ্য মানুষ হিসেবে থাকতে চায় না। যার ফলে সাঁওতালরা বিভ্রান্ত হয়ে ধর্মান্তরিত হতে থাকে।
সাঁওতালদের এতদিনের বিশ্বাসের উপর আঘাত আসতে লাগলো ধর্মব্যবসায়ী দিক থেকে। অনেকে ধর্মান্তরিত হতে লাগলো। সাঁওতালরা দেখলো ধর্মান্তরের ফলে সাঁওতাল সমাজে জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে। নিজেদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হচ্ছে। নিজেদের মানুষরাই নিজেদের এতদিনের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে কথা বলছে। এভাবে চলতে থাকলে তো সাঁওতালদের সমাজ ও ধর্ম অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। তাই সাঁওতাল সমাজ ও সাঁওতালদের ধর্মকে বিশ্বের প্রভাবশালী ধর্মগুলোর আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে সাঁওতালদের বিজ্ঞজনেরা এগিয়ে এলেন। সাঁওতালদের ধর্মের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য দেখে সাঁওতালদের ধর্মের নাম রাখলেন ‘সৗরিধরম’।
সাঁওতালদের ধর্মীয় রীতিনীতির কোনো লিখিত রূপ ছিলো না। কারাম বিন্তি, ভান্ডান বিন্তি, জমসিম বিন্তি এসব মৌখিক কথা ও গানের মধ্যে দিয়ে সাঁওতালদের ধর্ম যুগযুগ ধরে প্রবাহিত হয়েছে। সাঁওতালদের ধর্মগুরুরা সেগুলোও লিপিবদ্ধ করতে লাগলেন। সাঁওতালদের ধর্মগ্রন্থ হিসেবে যার নাম রাখা হলো ‘জমসিম বিন্তি’।
তাই বর্তমানে সাঁওতালরা গর্ব করে বলে আমরা বেদ্বীন বা ধর্মহীন নই। আমাদেরও ধর্ম
আছে। যারা নাম ‘সৗরিধরম’। আমাদেরও ধর্মগ্রন্থ আছে। যার নাম ‘জমসিম বিন্তি’।
