মৗঞ্জহিথান : সাঁওতালদের সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান
মৗঞ্জহিথান
প্রতিটি সাঁওতাল গ্রামে মৗঞ্জহি থান থাকে। এই মৗঞ্জহি থানকে কেন্দ্র করে সাঁওতালদের সামাজিক ও ধর্মীয় বিভিন্ন ক্রিয়াকর্ম অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। যার জন্যই মৗঞ্জহি থান একই সাথে সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য ৫টি পদ নিয়ে রয়েছে মৗঞ্জহি গাঁওতা। প্রতিটি পদের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। বড় গ্রামগুলোতে এই পদগুলোর সাথে সহকারী হিসেবে বাড়তি কিছু পদ যুক্ত হয়ে থাকে। গ্রামের সব মানুষ এই প্রতিষ্ঠানের সদস্য। সামাজিক ও ধর্মীয় বিভিন্ন ক্রিয়াকর্মের সময় প্রতিটি পরিবার থেকে চাঁদা প্রদান করা হয়।
মৗঞ্জহি থানের উৎপত্তি:
মৗঞ্জহি থানের উৎপত্তি হয়েছে সাঁওতালদের ধর্মবিশ্বাসকে কেন্দ্র করে। সাঁওতালদের ধর্ম সৗরিধরম এর ধর্মগ্রন্থ বা ধর্ম বৃত্তান্ত দেখলে দেখা যায়, স্রষ্টা ঠাকুর ও ঠাকরাণ অন্য সকল দেব-দেবী(বঙ্গা) নিয়ে স্বর্গে বসবাস করেন। সেখানে দেবতাদের সভা রয়েছে, যার নাম চৗউরিয়া মেলা। চৗউরিয়া মেলার কেন্দ্রীয় হলেন ঠাকুর ও ঠাকরাণ। অন্য দেব-দেবী বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। স্রষ্টার সেই চৗউরিয়া মেলার আদলেই পৃথিবীতে মানব সমাজের মধ্যে প্রতিষ্ঠা হয় মৗঞ্জহি থান। মৗঞ্জহি বঙ্গা ও মৗঞ্জহিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় সাঁওতাল গ্রাম। মৗঞ্জহি থান তৈরি করা হয় মাটি ও পাথর দিয়ে। তিন অথবা পাঁচ স্তরের বেদির উপর মাঝখানে পাথর রেখে তার উপর মাটির প্রলেপ দিয়ে ছোট পর্বতের মতো আকৃতি দেওয়া হয়। পাথর না পাওয়া গেলে শুধু মাটি দিয়েই তৈরি করা হয়। পর্বতকে সাঁওতালি ভাষায় বুরু বলা হয়। বুরু শব্দের সাথে বঙ্গা বা দেবতা শব্দের সম্পর্ক রয়েছে। সাঁওতালরা দেব-দেবীদের বলে বঙ্গাবুরু। গ্রামের বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানে মৗঞ্জহি থানে স্রষ্টা ঠাকুর ও ঠাকরাণকে পূজা করা হয় মৗঞ্জহি বঙ্গা নামে। মৗঞ্জহি গাঁওতার প্রথম পদাধিকারী মানুষ ছিলেন আদি পিতা-মাতা পিলচু হাড়া ও পিলচু বুডহি এর পাঁচ পুত্র। যাদেরকেও সাঁওতাল সমাজে ‘মড়ে কো’ নামে দেবতা হিসেবে পূজা করা হয়। যখন নতুন কোনো সাঁওতাল গ্রাম প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন যে পাঁচ পরিবার গ্রাম প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেন সেই পরিবাবেরর প্রধানরাই এই পাঁচ পদের অধিষ্ঠিত হন। তারপর বংশ পরম্পরায় এই পদ আবর্তিত হতে থাকে। যার জন্যই বলা যায় এই পাঁচটি পদ শুধু পদ নয়, বরং একটি গ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। তবে সাঁওতাল সমাজে এই পাঁচটি পদকে প্রাধান্য দিলেও যে কোনো সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় গ্রহণ করা হয়ে থাকে।
মৗঞ্জহি থানে পূজা করা হচ্ছে।
মৗঞ্জহি গাঁওতার পদসমূহ:
১. মৗঞ্জহি
মৗঞ্জহি গাঁওতার প্রধান পদ হলো মৗঞ্জহি বা মৗঞ্জহি বাবা। তিনি গ্রামের প্রধান। সাঁওতাল গ্রাম প্রতিষ্ঠা হয় মৗঞ্জহি থান ও মৗঞ্জহি এর বাড়ি নির্মানের মধ্য দিয়ে। মৗঞ্জহি সাঁওতাল গ্রামের নেতৃত্ব দেন। গ্রাম প্রতিষ্ঠায় প্রধান নেতৃত্ব দানকারী প্রবীণ ও বিজ্ঞ ব্যক্তিকেই মৗঞ্জহি করা হয়। প্রবীণ ও জ্ঞানী ব্যক্তি হওয়ার কারণে তাকে মৗঞ্জহি হাড়ামও বলা হয়ে থাকে এবং তার স্ত্রীকে বলা হয় ‘মৗঞ্জহি বুডহি’। হাড়াম শব্দের বাংলা অর্থ বৃদ্ধ বা প্রবীণ, বুডহি শব্দের বাংলা অর্থ বৃদ্ধা বা প্রবীণা। মৗঞ্জহিকে কেন্দ্র করেই সাঁওতাল গ্রাম পরিচালিত হয়। মৗঞ্জহির বাড়ির পাশেই মৗঞ্জহি থান প্রতিষ্ঠা করা হয়। বিভিন্ন সময় মৗঞ্জহিবাবা মৗঞ্জহি থানে মৗঞ্জহি বঙ্গার উদ্দেশ্যে পূজা করেন। আর মৗঞ্জহি বুডহি মৗঞ্জহি থান পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব পালন করেন। মৗঞ্জহি বাবা বিভিন্ন সময় নায়কের মাধ্যমে গ্রামের সবাইকে ডেকে আলোচনা সভা করেন। মৗঞ্জহি থানের পাশেই সভা হয়ে থাকে। এসব সভার মাধ্যমে সকলের মতামতের ভিত্তিতে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, উৎসবের দিনক্ষণ নির্ধারণ করেন। জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে সব ক্ষেত্রেই মৗঞ্জহিকে অবহিত করতে হয়। গ্রামীণ সালিশে উভয় পক্ষের মতামত শুনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়ে বিবাদের মিমাংসা করেন। মৗঞ্জহি কখনই নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন না। মৗঞ্জহির অনুপস্থিতিতে তার সন্তানকে দিয়ে নিয়ম রক্ষার কাজ পরিচালিত হয়।
২. পারানিক
মৗঞ্জহিকে বিভিন্ন কাজে বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহযোগিতা করেন পারানিক। মৗঞ্জহির অনুপস্থিতিতে নেতৃত্ব দেন পারানিক। মৗঞ্জহির কোনো উত্তরাধিকারী না থাকলে পারানিক মৗঞ্জহির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
৩. জগমৗঞ্জহি
জগমৗঞ্জহি হলেন তরুণ-তরুণীদের নেতা। জগমৗঞ্জহি স্বামী-স্ত্রী মিলেই সাঁওতালদে বিয়ে পরিচালনা করেন। বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানে জগমৗঞ্জহির নেতৃত্বেই তরুণ-তরুণীরা নাচ-গানে অংশগ্রহণ করেন। তরুণ-তরুণীদের সামাজিকীকরণের দায়িত্বও জগমৗঞ্জহি এর উপর থাকে। বড় গ্রামগুলোতে জগ মৗঞ্জহিকে সহযোগিতা করার জন্য জগপারানিক পদ থাকে।
৪. নায়কে
নায়কে হলেন ধর্মীয় ব্যক্তি। সাঁওতালদের বিভিন্ন উৎসবে পূজা করার দায়িত্ব থাকে নায়কের কাছে। যে কোনো ধর্মীয় কাজ নায়কের কাছ থেকেই শুরু হয়। জাহের থান, গট টৗন্ডি প্রভৃতি ধর্মীয় স্থানে নায়কে পূজা করেন। নায়কেকে সহযোগিতা করার জন্য থাকেন কুডৗম নায়কে। কুডৗম নায়কে পূজা করেন সিমৗ টৗন্ডিতে।
৫. গডেৎ
গডেৎ হলেন সংবাদ বাহক। বিভিন্ন সময় তিনি মৗঞ্জহির নির্দেশে গ্রামের মানুষকে ডেকে সভা আয়োজনে সহযোগিতা করেন। বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানে ভেজা বা চাঁদা উত্তলনের দায়িত্ব পালন করেন গডেৎ। মৗঞ্জহি গাঁওতার উপরিউক্ত পদগুলো অবৈতনিক। তবে গডেৎ পদটির জন্য গ্রামের প্রতিটি পরিবার প্রতি বছর নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা দিয়ে থাকেন।
সব শেষে বলা যায়, মৗঞ্জহি থান সাঁওতাল সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একটি গ্রামের মৗঞ্জহি থান দেখেই বুঝা যায় সেই গ্রামের সাঁওতালদের ধর্মীয় ও আর্থ-সামজিক অবস্থা। মৗঞ্জহি থান দেখেই বুঝা যায় গ্রামটি সাঁওতালদের। যে গ্রামে মৗঞ্জহি থান নেই, সেই গ্রাম সাঁওতালদের গ্রাম নয়। মৗঞ্জহি, পারানিক, জগমৗঞ্জহি, নায়কে, গডেৎ এই পদাধীকারী পরিবার দেখেই বুঝে নিতে হবে, তার গ্রামটি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তাই গ্রামের সবাই এই পদাধীকারীদের সম্মান করেন। যে গ্রামে এই পদাধীকারীদের সম্মান করা হয় না, সেই গ্রামে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। যে গ্রামে নির্বাচনের মাধ্যমে মৗঞ্জহি পরিবর্তন করা হয়েছে, সেই গ্রামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। তাই গ্রামের শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য মৗঞ্জহি থান ও মৗঞ্জহি গাঁওতা অবশ্যই উত্তরাধিকার ভিত্তিতেই থাকা প্রয়োজন। সাঁওতাল সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে মৗঞ্জহিদেরকে যথাযথ সম্মান ও সহযোগিতার করতেই হবে।
তথ্যসূত্রᱺ
১. জমসিম বিন্তি - সোমাই কিস্কু
২ᱹ হড়কোরেন মারে হাপড়ামকো রেয়াঃ কাথা - কলেয়ান হাড়াম
৩ᱹ জাহের বঁগা সান্তাড় ক - রামেশ্বর মুরমু(অৗদিম সান্তাড়)

